Header Ads

Header ADS

প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলছে না কর্মসংস্থান

ভারসাম্যহীন শ্রমবাজার-৩

জাহিদুল ইসলাম
বাংলাদেশের খবর

শিল্পায়নের সঙ্গে অর্থনীতির আকার বাড়লেও পিছিয়ে পড়ছে দেশের কৃষি খাত। গত অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান নেমে এসেছে ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশে। অথচ এ খাতেই কর্মরত দেশের শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৩ ৬০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুসংখ্যক শ্রমিক কৃষিকাজ ছাড়লেও সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির শিল্প খাতে তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে জীবনধারণের জন্য স্বল্প পারিশ্রমিকের সেবা খাতেই ভিড়ে যাচ্ছেন কৃষির বাড়তি শ্রমিক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে ধীরগতিতে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছর জিডিপিতে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষিতে শ্রমিক কমেছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
১০ দশমিক ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে শ্রমবাজারে আসছে ৫ কোটি ২৩ লাখ শ্রমশক্তির বড় অংশ কৃষি খাতে বড় ভরসা দুর্বল সেবা খাত বেড়ে চলেছে আয় বৈষম্য মাত্র ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। একই সময়ে সেবা খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ অবস্থায় দেশে কর্মসংস্থান সহায়ক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না বলে দাবি করছেন অর্থনীতিবিদরা। এমন প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটাই চিন্তিত তারা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম প্রতি ১০০ মানুষের ওপর নির্ভরশীল ৫৯ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী আছেন ৭৯ লাখ ১৫ হাজার জন। অন্যদিকে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ২২ লাখ ৮৫ হাজার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এদের একটা বড় অংশ কর্মবাজারে প্রবেশ করবে। অথচ দেশে মোট বেকারের বড় অংশই এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর। শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২১ লাখ ৩১ হাজার মানুষ এখন বেকার। অন্যদিকে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। 

বাংলাদেশের খবর

এ হিসাবে বেকারদের ৭৯ দশমিক ৬০ শতাংশই তরুণ। কর্মবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা জনশক্তির জন্য প্রতি বছর বাড়তি ১৬ লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে কাজে যোগ দেওয়ার বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৬১ লাখ। গত অর্থবছর শেষে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৯৩ লাখে। এ হিসাবে এক বছরে ৩২ লাখ মানুষ শ্রমশক্তিতে যোগ দিয়েছে। একই সময়ে শ্রমবাজারে যোগ দিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ। এর মধ্যে এক বছরে ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ হিসাবে কর্মসংস্থানের ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ মানুষের। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে ৭ লাখ মানুষ কৃষি থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২ কোটি ৫৪ লাখ থেকে কমে গত অর্থবছর কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখে। এর মধ্যে শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ২ লাখ শ্রমিকের। অর্থবছর শেষে এ খাতে শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ। শ্রমবাজারে নতুন আসা জনশক্তির পাশাপাশি কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের গন্তব্য এখন সেবা খাত। এ খাতে গত অর্থবছর ১৭ লাখ শ্রমিক যোগ দিয়েছে। বছর শেষে সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ। আগের অর্থবছর এ খাতে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। এ হিসাবে সেবায় কর্মসংস্থান এক বছরে বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হলেও তা কর্মসহায়ক হচ্ছে না। প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে এলেও কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ১৩ লাখের। একই পরিমাণ বিনিয়োগে আগে যেখানে পাঁচজন শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা হতো সেখানে এখন হচ্ছে তিনজনের। জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো তাওফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, শিল্প খাতে এক যুগের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাবে। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান না বাড়লে প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমজীবীরা পায় না। ফলে আয়ে বৈষম্য বেড়েই চলেছে। তিনি আরো বলেন, প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্পে কর্মসংস্থান কমে আসছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আগামীতে বারত্রাণের শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়নের তাগিদ দেন তিনি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে গড়ে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে। ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০ সময়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২০ শতাংশে উন্নীত হলেও কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মসংস্থান হচ্ছে না বলে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বছরে গড়ে ১৬ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। 'সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস জবলেস গ্রোথ?' শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতি মাসে ১ লাখ ৭০ হাজার মুখ যুক্ত হবে শ্রমবাজারে। দীর্ঘমেয়াদে তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এক শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ১ লাখ ১০ হাজার কর্মসংস্থান হচ্ছে। ভারতে এ হার সাড়ে ৭ লাখ এবং পাকিস্তানে ২০ লাখ।

 প্রতিবেদনটি ০৪ মে ২০১৯ তারিখে দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই লিংক ফলো করুন।

No comments

Theme images by Leadinglights. Powered by Blogger.