১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা আয়ের হাতছানি
সাসেক কানেকটিভিটি
জাহিদুল ইসলাম![]() |
| Sasec |
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) হিসাবে প্রতি মাসে ৪০১ ডলারের বেশি আয় করেন এমন ধনীর সংখ্যা বাংলাদেশে ১ কোটি ১৭ লাখ। ২০২৫ সালে এ সংখ্যাটি ৩ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশটিতে গাড়ির চাহিদা বাড়ছে বছরে ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ হারে। সংযোজন শিল্প গড়ে না ওঠার পাশাপাশি উচ্চশুল্কের কারণে ৯ হাজার থেকে ২৬ হাজার ডলারে পুরনো গাড়ি আমদানি করে এ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। নিজস্ব শিল্প গড়ে তুলে ভারত থেকে যন্ত্রাংশ এনে সংযোজন করে দেশের বাজারে ২০ হাজার ডলারে নতুন গাড়ি সরবরাহ সম্ভব বলে মনে করে এডিবি। সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে এসব গাড়ি বিনাশুল্কে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশের মোট দেশজ আয় (জিডিপি) ৭৫০ কোটি ডলার বৃদ্ধির পাশাপাশি এক দশকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব বলে ধারণা দিয়েছে সংস্থাটি। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশনের (সাসেক) আওতায় পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ছয় দেশের জাতীয় আয় বছরে ৭ হাজার কোটি ডলার বৃদ্ধি সম্ভব বলে মনে করে এডিবি। এর মধ্যে বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়বে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আরও ৩০০ কোটি ডলার সাশ্রয় হওয়ায় বাংলাদেশের মোট লাভের পরিমাণ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতার কারণে সাসেক অঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষের কাজের সংস্থান হবে বলে মনে করে এডিবি। এর মধ্যে বাংলাদেশে নতুন ৭৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের হাতছানি রয়েছে।
কর্মসংস্থান হবে ৭৫ লাখ
ছয় উদ্যোগ
বাস্তবায়নের সুপারিশ
করেছে এডিবির
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগে বরাবর সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগ তথা ভৌত অবকাঠামো এবং ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টকে গুরুত্ব দেয়া হলেও এডিবির নতুন প্রস্তাবে সাসেক অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে পারস্পরিক সহযোগিতাকে প্রাধান্য দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তিনটি ক্ষেত্রে মোট ছয়টি উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নতুন প্রস্তাবনায়। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও পরিবহনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে নতুন প্রস্তাবে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কাকে এ অঞ্চলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে এতে।
এর বাইরে বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজনের কারখানা স্থাপন, মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, সাসেক অঞ্চলকে পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত বৈদ্যুতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে এডিবি।
সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সাসেক অর্থমন্ত্রীদের সভায় এডিবির এ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বৈঠকে অর্থমন্ত্রীরা একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেছেন বলেও জানা গেছে। ২০০১ সাল থেকে এ অঞ্চলের ছয় দেশ তথা বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও নেপাল সাসেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ভৌত অবকাঠামো খাতে ৪৬ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার। চলমান প্রকল্পগুলোর বাইরে সাসেক কর্মসূচির আওতায় আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে নতুন এ প্রস্তাব দিয়েছে এডিবি।
আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বলে এডিবির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে স্থলবেষ্টিত দেশগুলো বাণিজ্য বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার নিশ্চিত হলে এসব দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও শিল্প খাতের বিকাশ নিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বার্ষিক আয় ৪০০ কোটি ডলার বাড়তে পারে।
![]() |
| আলোকিত বাংলাদেশ |
ভারত থেকে পেট্রোকেমিক্যাল আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের বৈপ্লবিক উন্নতি সম্ভব বলে ধারণা দেয়া হয়েছে প্রস্তাবনায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ৯৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে ১০০ কোটি ডলার সাশ্রয় সম্ভব বলে দাবি করেছে এডিবি। আর গাড়ি সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বার্ষিক আয় বাড়ানো সম্ভব ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত।
সাসেক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলেও প্রস্তাবনায় ধারণা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে বাংলাদেশ এখনও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় আগামী দশকেই বাংলাদেশে গ্যাসের সরবরাহ তলানিতে নেমে আসবে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গ্যাস ও কয়লা আমদানির মতো বিকল্প অনুসন্ধান বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে সাসেক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি করলে বাংলাদেশ প্রতি বছর এ খাতে ১৬০ কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারবে বলে মনে করে এডিবি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসাইন আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সাসেকের আওতায় সড়ক ও রেল সংযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর বেশি ঝুকি নেয়ার সামর্থ্য নেই। প্রায় প্রতিটি দেশেই বিনিয়োগের পরিবেশে মন্দা বিরাজ করছে। তা ছাড়া আন্তরাষ্ট্রীয় প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা থাকে। এ সব সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বহুল আলোচিত কিছু কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জমি সমস্যার সমাধানে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার প্রক্রিয়াও অনেকটা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। উৎপাদন বাড়লেও বিদ্যুত পরিস্থিতি এখনো কাঙ্খিত মানে উন্নত হয়নি। তা ছাড়া উপ আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আমদানি শুল্ক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সব সমস্যার সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হলে বেসরকারি খাত দ্রুত সাড়া দেবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।
প্রতিবেদনটি ১৪ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই লিংক ফলো করুন।

.jpeg)
No comments