Header Ads

Header ADS

ঝুঁকিতে ৫ কোটি শ্রমিক

ভারসাম্যহীন শ্রমবাজার-১

জাহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশের খবর
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল দেশের রফতানি আয়ের বৃহৎ উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। তবে রানা প্লাজা ধসের পর সংস্কার কার্যক্রমে বদলে গেছে এ খাতের পরিবেশ। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিচারে পোশাক শিল্প দশম অবস্থানে নেমে এসেছে। এ সময় কল-কারখানা পরিদর্শন পরিদফতরকে অধিদফতরে উন্নীত করে বাড়ানো হয়েছে সক্ষমতা। পরিবর্তন করা হয়েছে শ্রম নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি-বিধান। সাভারে স্থানান্তরের পর চামড়া শিল্পে কাজের পরিবেশের উন্নতিও লক্ষণীয়। তবে কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নেওয়া এসব উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমিকের নিরাপত্তায় নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ, নেই কোনো কর্তৃপক্ষও।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬- ১৭ অর্থবছর দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন ৬ কোটি ৪ লাখ মানুষ। এদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আছেন মাত্র ৮৭ লাখ। কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তায় সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) আছে নানা উদ্যোগ।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের বড় অংশ 
নেই নিয়োগপত্র ও নির্ধারিত বেতন 
নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেই কর্তৃপক্ষ 
বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা

দাবি আদায়ে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা বিভিন্ন সংগঠনেও যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে অনেকটাই নিরাপদ। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এখনো ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত আছেন বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শ্রমে নিয়োজিত মোট জনশক্তির বিচারে এ হার ৮৫ দশমিক ১০ শতাংশ। শ্রম নিরাপত্তায় নেওয়া সরকারের বিধি-বিধান ও ব্যক্তি খাতের উদ্যোগে এই শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা করা হয় না। নিজেদের দাবি আদায়ে তারা কোনো সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা।

বাংলাদেশের খবর
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিরসন, শিশুশ্রম নির্মূল, নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেতন বৈষম্য দূর করাসহ সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল কেবল প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই পেয়ে আসছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রম আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। এ খাতকে লাইসেন্সের আওতায় এনে নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বড় ভূমিকা রয়েছে।

এ খাতেই সবচেয়ে বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনায় ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নিশ্চিত হলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা কিছুটা সুবিধা পাবেন। কী ধরনের ব্যবসায় কতজন শ্রমিক নিয়োজিত থাকবেন, তাদের মজুরি কত হবে তা ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার সময় জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ গঠন করে এসব শর্ত পরিপালনের বিষয়ে নজরদারি করলেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমের নিরাপত্তা বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কোনো নিয়োগপত্র নেই। নেই নির্ধারিত বেতন। এর ফলে মালিকরা শ্রমিক ঠকানোর সুযোগ নিতে পারেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ শ্রম আইন সব খাতের শ্রমিকদের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একে ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে আসা দরকার বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।

অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও কারখানায় কর্মপরিবেশের উন্নতি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি বলে মনে করেন শ্রমিকনেত্রী মোশরেফা মিশু। তিনি বলেন, এখনো অনেক কারখানায় ন্যূনতম মজুরি দেওয়া হয় না। ভূমিকম্পে অনেক ভবনেই ফাটল ধরেছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই কাজ করছেন শ্রমিকরা। নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ঘাম পুঁজি করে মালিকপক্ষ ব্যবসা পরিচালনা করছে। শ্রমিকদের শোষণ করতে তারা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে স্বৈরাচারী উৎপাদন ব্যবস্থা। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারও নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

সরকার ও মালিকপক্ষের বাইরে কেউ ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারছেন না। মহান মে দিবসকে সামনে রেখে এ পরিস্থিতির অবসান চান তিনি। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় শিশুশ্রম নিরসন হচ্ছে না বলে দাবি করছে বিবিএস। সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রম জরিপ অনুযায়ী, দেশে এখন ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত আছে। তাদের এক তৃতীয়াংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে।

এক দশক আগে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ। সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৪ লাখ শিশু কাজ করে ঢাকা বিভাগে। এর পরই চট্টগ্রামের অবস্থান। মূলত পরিবহন ও গুদামজাতকরণ, পাইকারি ও খুচরা ব্যবস্যা, যানবাহন মেরামত, নির্মাণ ও খনিজ খাতে শিশু শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা দেখা যায়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের বড় অংশ পুরুষ। তারা মূলত কৃষিকাজে নিয়োজিত। দেশে ১৫ বছর বা এর বেশি বয়সী ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার। আর নারী শ্রমিক ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পল্লী অঞ্চলের ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। শহরাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আছেন ১ কোটি ৩০ লাখ ৯৩ হাজার। কৃষিকাজে নিয়োজিত জনশক্তির মাত্র ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ কাজ করেন প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর ৯৫ দশমিক ৪০ শতাংশই নিয়োজিত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এ ছাড়া শিল্পে নিয়োজিত ৮৯ দশমিক ৯০ শতাংশ ও সেবা খাতের ৭১ দশমিক ৮০ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত আছেন।

প্রতিবেদনটি ০১ মে ২০১৯ তারিখে দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই লিংক ফলো করুন।

No comments

Theme images by Leadinglights. Powered by Blogger.