Header Ads

Header ADS
http://bit.ly/2wTWH4k


পরিবহণের উন্নয়নে বেসরকারিবিনিয়োগ টানার উদ্যোগ


জাহিদুল ইসলাম
সরকারের উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে পরিবহণ খাত। সড়ক, রেল, সেতু, নৌ ও বিমান মিলে আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) পরিবহণের উন্নয়নে বরাদ্দ আছে ৫২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। এডিপির একচতুর্থাংশের বেশি বরাদ্দ নিয়েও এ খাতে অর্থের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। পরিবহণ অবকাঠামোর উন্নয়নে অর্থের যোগান পেতে বেসরকারি খাতের দ্বারস্থ সরকার। এরই ধারবাহিকতায় সরকারি-বেসরকারি অংশিধারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য আগামী অর্থবছরের এডিপিতে পরিবহণ খাতের ৪১ প্রকল্প রাখা হয়েছে। গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) অনুমোদন পাওয়া নতুন এডিপি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য নতুন এডিপিতে ৬২ প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ টি সড়ক নির্মাণ, একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, দুইটি মেট্রোরেল নির্মাণ ও একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে। পিপিপি ভিত্তিতে রেলওয়ের ১২ প্রকল্পের মধ্যে ১১ টি হাসপাতাল, শপিং কমপ্লেক্স ও হোটেল-মোটেল নির্মাণ সংক্রান্ত। ঢাকা শহরের চারপাশে বৃত্তাকার রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি পিপিপিতে বাস্তবায়ন করতে চায় রেলওয়ে। এ ছাড়া নদী ড্রেজিং, নৌ ও বিমান বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণের মতো প্রকল্পও পিপিপিতে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে এডিপিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেটে সারকারি তহবিলের উপর চাপ কমাতে বিকল্প অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে পিপিপিকে অধিক কার্যকর বলে মনে করছে সরকার। এর ফলে সরকারি অর্থব্যয় কমার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কাজে আসবে। অবকাঠামো উনন্নয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবহন খাত। তাই এ খাতের প্রকল্পই বেশি পিপিপিতে করার প্রস্তাব রয়েছে। 
পিপিপিতে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সফলতা নিয়ে বরাবরই সন্দিহান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রথম দফায় দায়িত্ব নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে পিপিপি খাতে গুররুত্ব দিয়ে আসছে মহাজোট সরকার। এ সময়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ছাড়া পিপিপি খাতে বড় কোনো প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। লাভের সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা না থাকলে অবকাঠামো খাতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। তা ছাড়া পিপিপি খাতে উন্নয়ন করা সড়কে টোল আরোপের প্রয়োজন হবে। ফলে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতে ব্যয় বাড়বে আরেক দফা। অব্যশ বিনিয়োগের পরিবেশ আর লাভসহ অর্থ উঠে আসার সম্ভাবনা থাকলে বেসরকারি খাত পিপিপি প্রকল্পে উৎসাহী হবে আশা ব্যবসায়ী নেতাদের।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আগামী ১৩ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৯২ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এ অর্থের মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থায়ন বিদেশি উৎস থেকে পাওয়া যাবে। সরকারের একার পক্ষে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। অপর দিকে ব্যক্তি খাতে যথেষ্ট ধনিক শ্রেণী তৈরি হয়েছে, বিনিয়োগকারী রয়েছে। তাদের সম্পদও যাতে উন্নয়নে কাজে লাগানো যায় তার জন্যই পিপিপির উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এতে সরকারে অর্থের চাপও কিছুটা কমল, আবার বেসরকারি খাতও কিছু বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ পেল।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বাংলাদেশে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সফলতার হার এমনিতেই কম। দীর্ঘসূত্রতার কারণে কয়েকগুণ বাড়তি ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় পিপিপি খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ সড়ক উন্নয়নে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে কতটুকু এগিয়ে আসবে এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তা ছাড়া বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা না রেখে রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে টোল আরোপ করা উচিত হবে না বলে তিনি মনে করেন।
সড়ক অবকাঠামো খাতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে রেলপথ উন্নয়নে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দেশে এখন পর্যাপ্ত সড়ক রয়েছে। পরিবেশ ও ব্যয় বিবেচনায় রেলের উন্নতি নিশ্চিত করলে সড়কের ওপর চাপ কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, বেসরকারি খাতের টাকা নিয়ে সড়কের কাজ করলে বাংলাদেশেও টোল প্রয়োগ করতে হবে।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সহ-সভাপতি মো. ছিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ আর লাভসহ আসল উঠে আসার সম্ভাবনা থাকলে পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন উদ্যোক্তারা। অতীতে পিপিপি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশাবাদ শোনানো হলেও এ খাতে বিনিয়োগ সহজ করা হয়নি। পরবর্তীতে বেশ কিছু বিষয় শিথিল করা হয়েছে। বিনিয়োগে, কর, ভ্যাটসহ আরও কিছু বিষয়ে সহজীকরণের সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ হচ্ছে না। যথাযত নীতিসহায়তা থাকলে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে পিপিপি প্রকল্প। 
জানা গেছে, মোট বিনিয়োগ প্রকল্পের ৩০ শতাংশ পিপিপির আওতায় বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে। ইতোমধ্যেই পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে পিপিপি আইন, প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন, গাইডলাইন ফর দ্য আনসলিকটেড প্রপোজাল এবং পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালা-২০১৭ ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত পিপিপি প্রকল্প তালিকায় রয়েছে বেশ কটি বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীত করণ প্রকল্প। এছাড়া রয়েছেÑ ইমপ্রুভমেন্ট অব হাতিরঝিল (রামপুরা ব্রিজ) আমুলিয়া-ডিমরা ব্রিজ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। গাবতলী-নবীনগর মহাসড়ককে এক্সেস কন্ট্রোল্ড সড়কে উন্নীতকরণ প্রকল্প, আনুমাকি প্রকল্প ব্যয় ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। উভয় পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণসহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ ভিত্তিতে হাটিকামরুল-নাটোর-রাজশাহী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে আনুমানিক ব্যয় ৭ হাজার কোটি টাকা।  ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য বিভাগীয় শহরের সড়ক নেটওয়ার্ক চারলেনে উন্নীত করা হয়েছে, কিন্তু রাজশাহী বাদ পড়েছে। তাই এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-রাজশাহী সংযোগ সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ ভিত্তিতে নবীনগর-মানিকগঞ্জ সড়ক প্রকল্প উন্নয়ন, আনুমাকি প্রকল্প ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি ও ডিটেইল ডিজাইনের কাজ চলমান রয়েছে। ঢাকা সার্কুলার রুট : ২য় অংশ (আব্দুল্লাপুর-ধউর-বিরুলিয়া-গাবতলি-বাবুবাজার-ফতুল্লা-চাষাড়া-সাইনবোর্ড) শীর্ষক পিপিপি প্রকল্প (৬৭ কিলোমিটার)। উভয় পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণসহ ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক এক্সপ্রেসওয়ে-তে উন্নীত করণ, ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য ব্যয় হবে ২০ কোটি টাকা। 
সেতু কর্তৃপক্ষের ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয় নির্মাণ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। ডিটেইল ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন, অপারেশন অ্যন্ড মেইনটেনেন্স অব ম্যাস রেপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-২ প্রকল্প, ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ডিটেইল ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন, অপারেশন অ্যন্ড মেইনটেনেন্স অব ম্যাস রেপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৪ প্রকল্প, ব্যয় প্রায় ২৮ হজার ৪৮০ কোটি টাকা।
এছাড়াও পিপিপির জন্য বিবেচ্য রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৭টি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ৬টি, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৬টি প্রকল্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ, মিরপুর ৯ নং সেকশনে স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ, মহাখালিতে ৪৬৬২টি ফ্যাট সম্বলিত বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ, শান্তিনগর থেকে ৪র্থ বুড়িগঙ্গা ব্রীজ হয়ে ঢাকা-মাওয়া রোডের ঝিলমিল প্রকল্প পযন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং মোংলা পোর্ট টাওয়ার নির্মাণ ইত্যাদি।
প্রসঙ্গত ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দায়িত্ব নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন মডেল হিসেবে পিপিপি ব্যবস্থা বেছে নেয় সরকার। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পিপিপির মাধ্যমে সমুদ্র ও বিমানবন্দর, সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল, সড়ক ও রেলপথ এবং বড় বড় সেতু নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন। প্রতি বছর ৩৯ হাজার কোটি টাকা হিসাবে পাঁচ বছরে এক লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা পিপিপি থেকেই পাওয়া যাবে বলেও আশা করেছিলেন তিনি।
ওই সময় থেকে দুই মেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকারের প্রতিটি বাজেটেই পিপিপি খাত নিয়ে আশাবাদ শোনানো হয়েছে। অর্থবছর শেষে শোনানো হয়েছে ব্যর্থতার কথাও। তবে বিগত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রথমবারের মতো পিপিপি ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সফলতার কথা বলেছেন। আগামী অর্থবছরের বাজেটে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখবেন বলে জানা গেছে। 
শুরু থেকেই বাংলাদেশে পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে দাতাসংস্থা বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে পিপিপি উন্নয়নে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রস্তাাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিবেচনায় বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে মারাত্মক হারে পিছিয়ে রয়েছে। ১৪৪টি দেশের মধ্যে অবকাঠামো সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। এ অবস্থায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ জিডিপির আরও তিন শতাংশ বাড়াতে হবে।

No comments

Theme images by Leadinglights. Powered by Blogger.